বিদেশে চাকরি ২০২৬ সালে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা ও বড় কিছু পরিবর্তনের বছর। আনুমানিক ১ কোটি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ প্রবাসী বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত, এবং সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৬-২৮ বিলিয়ন ডলার। সরকারি উদ্যোগ, আইন সংস্কার ও ডিজিটাল সুবিধা বিদেশগামীদের জীবনকে সহজ করেছে, তবে প্রতারক চক্রের ফাঁদ থেকে বাঁচতে সঠিক তথ্য জানা এখন আগের চেয়েও বেশি জরুরি।
এই গাইডে ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ধাপে ধাপে জানাব — কোন দেশে কী পরিমাণ বেতন, কীভাবে আইনি সুরক্ষা পাবেন, ভিসা ও পাসপোর্ট প্রক্রিয়া, রেমিট্যান্সে নগদ প্রণোদনা, এবং প্রবাস জীবনে ঠকে না যাওয়ার উপায়। মনে রাখবেন, নিয়ম ও খরচ সময়ের সাথে বদলায়; দূতাবাসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা বিএমইটি-র অফিসিয়াল সাইট থেকে যাচাই করে নিন।
![বিদেশে চাকরি ২০২৬ তে বিমানে প্রবাসী কর্মী — {'titles': []}](images/dhaka-airport-departure-2026.jpg)
২০২৬ সালে বিদেশে চাকরির শীর্ষ গন্তব্যসমূহ ও কর্মীসংখ্যা
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ১২-১৪ লাখ কর্মী বিদেশে যান। ২০২৫ সালে বিএমইটি ১২-১৪ লাখ অভিবাসন ছাড়পত্র (এমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স) দিয়েছিল, এবং ২০২৬ সালেও একই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা। শীর্ষ গন্তব্যগুলোতে মোট কর্মীর পরিমাণ:
- সৌদি আরব: প্রায় ২৫-২৮ লাখ বাংলাদেশি (নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, গৃহকর্ম, ড্রাইভিং)
- সংযুক্ত আরব আমিরাত: ১০-১২ লাখ (নির্মাণ, হোটেল, খুচরা)
- মালয়েশিয়া: ৮-১০ লাখ (প্লান্টেশন, উৎপাদন, নির্মাণ)
- ওমান: ৭-৮ লাখ (নির্মাণ, প্রকৌশল সহায়তা)
- কাতার: ৩-৪ লাখ (নির্মাণ, নিরাপত্তা, গৃহকর্ম)
- সিঙ্গাপুর: ১.৫-২ লাখ (নির্মাণ, জাহাজ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা)
দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ায় ২০২৬ সালে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

নতুন প্রবাসী আইন ২০২৫: কী সুবিধা ও সুরক্ষা মিলছে?
দীর্ঘ ৪৩ বছর পুরনো ‘এমিগ্রেশন অর্ডিন্যান্স-১৯৮২’ বাতিল করে ২০২৫ সালে ‘বহির্দেশে কর্মসংস্থান ও অভিবাসন কল্যাণ আইন’ পাস হয়েছে। এই আইনের আওতায় বড় পরিবর্তন:
- নিয়োগকারী এজেন্সির জালিয়াতি ও অতিরিক্ত ফি নেওয়া বন্ধে কঠোর শাস্তির বিধান। এখন সর্বোচ্চ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে (প্রায় ১-২ মাসের বেতনের সমান), বেশি নিলে এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও কারাদণ্ড হতে পারে।
- কর্মী হয়রানি ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।
- বিদেশে নির্যাতিত কর্মীর আইনি সহায়তা নিশ্চিতে দূতাবাসে মাইগ্রেন্ট ওয়েলফেয়ার অফিসারের ক্ষমতা বৃদ্ধি।
- প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের অধীনে বাধ্যতামূলক বিমা প্রকল্প সম্প্রসারণ। মৃত্যুবরণ করলে বা আহত হলে ক্ষতিপূরণ সহজ হয়েছে।
এই আইনের পুরো কার্যকারিতা দেখতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে, তবে এটি প্রবাসীদের জন্য একটি বড় অগ্রগতি। সরকারি সূত্র বলছে, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ ১২০টির বেশি ভুয়া এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জনপ্রিয় দেশে বেতন ও জীবনযাত্রার তুলনা (আগস্ট ২০২৬)
নিচের তালিকায় বিভিন্ন দেশে একজন সাধারণ নির্মাণ/শ্রমিক কর্মীর আনুমানিক মাসিক আয় ও সুবিধা দেওয়া হলো। বেতন ওভারটাইমের ওপর নির্ভর করে বাড়তে পারে।
| দেশ | পেশা | মাসিক বেতন (স্থানীয় মুদ্রা) | বাংলাদেশি টাকায় (প্রায়)* | অতিরিক্ত সুবিধা |
|---|---|---|---|---|
| সৌদি আরব | নির্মাণ শ্রমিক | এসএআর ১,২০০ – ১,৮০০ | ৩৩,০০০ – ৫০,০০০ | থাকা, খাবার ও স্বাস্থ্যবিমা |
| মালয়েশিয়া | প্লান্টেশন/নির্মাণ | আরএম ১,৭০০+ (ওভারটাইম আলাদা) | ৪০,০০০ – ৬০,০০০+ | বাসস্থান ও খাবারের ব্যবস্থা সাধারণত নিয়োগকর্তা দেন |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | নির্মাণ/শ্রমিক | এএইডি ১,০০০ – ১,৫০০ | ২৫,০০০ – ৪০,০০০ | থাকা, পরিবহন; কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমা |
| কাতার | নির্মাণ/শ্রমিক | কিউএআর ১,০০০ + ভাতা (খাবার/থাকা বাবদ ৫০০+) | সর্বসাকুল্যে প্রায় ২৮,০০০ – ৪৫,০০০ | ন্যূনতম মজুরি আইন বলবৎ; থাকা-খাবার আলাদা দেয় |
| ওমান | নির্মাণ/শ্রমিক | ওমানি রিয়াল ১০০ – ১৫০ | ২৭,০০০ – ৪০,০০০ | থাকা, পরিবহন |
| বাহরাইন | নির্মাণ/শ্রমিক | বিএইচডি ৯০ – ১২০ | ২৫,০০০ – ৩৩,০০০ | থাকা ও খাবার |
* ১ সৌদি রিয়াল = প্রায় ২৮ টাকা, ১ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত = প্রায় ২৪ টাকা, ১ ইউএই দিরহাম = ৩০ টাকা, ১ কাতারি রিয়াল = ৩০ টাকা হিসেবে আনুমানিক। বিনিময় হার ওঠানামা করতে পারে।
সৌদি আরবে নির্মাণশ্রমিকের আয়: বাস্তবতা
সৌদি আরব বাংলাদেশি কর্মীদের সবচেয়ে বড় বাজার। ২০২৬ সালে সাধারণ নির্মাণ শ্রমিকের বেতন ১,২০০ থেকে ১,৮০০ রিয়ালের মধ্যে, যা ওভারটাইমে বাড়তে পারে। অভিজ্ঞ কারিগর (রাজমিস্ত্রি, শাটার কারিগর) ২,০০০ রিয়ালের কাছাকাছি পান। বেশিরভাগ কোম্পানি আবাসন, খাবার ও স্বাস্থ্য সেবা দেয়। তবে মধ্যবর্তী দালালের মাধ্যমে গেলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বেতনের চেয়ে কম পেতে পারেন; তাই সরাসরি নিবন্ধিত এজেন্সি ও সরকারি চুক্তির (সৌদি সরকারের ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্পে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিশেষ কোটা আছে) মাধ্যমেই আবেদন করুন।
মালয়েশিয়া নতুন কর্মী নেওয়া বন্ধ? জানুন সর্বশেষ
মালয়েশিয়া সরকার ২০২৫ সালে বেশ কয়েকটি সেক্টরে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার ওপর কোটা পুনর্বিবেচনা করে সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে আবার ধীরে ধীরে কিছু খাতে (বিশেষ করে প্লান্টেশন ও নির্মাণ) অনুমোদন শুরু হয়েছে। ন্যূনতম বেতন ১,৭০০ রিঙ্গিত, কিন্তু চুক্তিতে ওভারটাইম, ছুটির দিনের কাজ ইত্যাদি যোগ করে আয় ২,৫০০ রিঙ্গিত ছাড়াতে পারে। স্থগিতাদেশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিকটস্থ বিএমইটি কার্যালয় বা মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের ওয়েবসাইট দেখুন। আপাতত ‘অনলাইন সার্ভিস’ মাধ্যম ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে নতুন ভিসা প্রায় বন্ধই আছে।

কাতার ও ইউএই: কাফালা বাতিলের পর আপনার অধিকার
কাতার ২০২০ সালে এবং ইউএই ২০২২ সালে পুরনো কাফালা (স্পন্সরশিপ) প্রথা বাতিল করেছে। এখন কর্মী ইচ্ছা করলেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চাকরি পরিবর্তন করতে পারেন – নির্দিষ্ট নোটিস পিরিয়ড মানলেই চলবে। কাতারে ন্যূনতম মজুরি আইন চালু: ১,০০০ রিয়াল মূল বেতনের সঙ্গে ৫০০ রিয়াল খাবার ও ৫০০ রিয়াল থাকার ভাতা নিশ্চিত করা আছে (অনেকেই পুরোটা একত্রে প্রদান করেন)। ইউএই-তে একইভাবে নতুন ‘ফেডারেল শ্রম আইন’ কর্মীর চলাচলের স্বাধীনতা দিয়েছে। তবু বাস্তবে অনেক নিয়োগকর্তা পুরনো রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেন; তাই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে লিখিত থাকতে হবে এবং অত্যাচারিত হলে স্থানীয় শ্রম আদালতে যেতে দ্বিধা করবেন না।
রেমিট্যান্স পাঠানোর সর্বোত্তম উপায় ও নগদ প্রণোদনা
প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স রেকর্ড ২৬-২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স আহরণে নগদ প্রণোদনা দেয়, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য:
- ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি ওয়্যার ট্রান্সফার: ২.৫%
- মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট): ২.০%
কোনো এজেন্ট বা দালালের মাধ্যমে টাকা পাঠাবেন না। ব্যাংক চ্যানেল সবচেয়ে নিরাপদ এবং এতে প্রণোদনার পুরো টাকা সরকারি হিসাব থেকে সরাসরি পৌঁছে যায়। প্রণোদনার হার প্রতিবছর সরকার ঘোষণা করে; সাম্প্রতিক তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট দেখতে পারেন।
বিদেশ যাওয়ার ধাপসমূহ: ই-পাসপোর্ট থেকে বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স
বিদেশে চাকরি ২০২৬ সালে পেতে গেলে নিচের ধাপগুলো মেনে চলতে হবে। একটি ধাপও এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতে জটিলতায় পড়বেন।
- ই-পাসপোর্ট: বর্তমানে প্রবাসী কর্মীদের জন্য ৪৮ পৃষ্ঠার ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক। তাড়াতাড়ি পেতে ‘জরুরি’ সার্ভিসে বেশি টাকা লাগবে। সাধারণ ফি ৫,৭৫০ টাকা; জরুরিতে ৮,০০০-১০,০০০ টাকা হতে পারে। পাসপোর্ট অফিস থেকে রসিদ বুঝে নিন।
- বিএমইটি নিবন্ধন: পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, ভিসার কপি, নিয়োগকর্তার চুক্তিপত্র নিয়ে নিকটস্থ বিএমইটি কার্যালয়ে বা অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। অনলাইন লিংক: বিএমইটি নিবন্ধনের বিস্তারিত গাইড।
- মেডিকেল পরীক্ষা: সরকার নির্ধারিত মেডিকেল সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে; খরচ প্রায় ১,৫০০ – ২,০০০ টাকা। ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া ক্লিয়ারেন্স পাবেন না।
- প্রি-ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশন: এখন আংশিক অনলাইনেও হয়। দেশের আইন, সংস্কৃতি, নিরাপত্তা ও প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে ৩-৪ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক।
- স্মার্টকার্ড ও বিমা: প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের আওতায় ‘ওয়েজ আর্নার্স ডাটাবেস’-এ অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। বছরে ২ ডলার সমমূল্যের লেভি দিতে হয়, যা বিমা ও কল্যাণ সুবিধা দেয়।
উল্লেখ্য, দেশ ভেদে কিছু অতিরিক্ত চাওয়া থাকতে পারে; তাই সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের নির্দেশনাও দেখবেন।
প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড ও বিমা: জরুরি সেবা
ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড (WEWB) এর আওতায় বিদেশে মৃত্যু, সম্পূর্ণ বা আংশিক পঙ্গুত্ব, চিকিৎসা খরচ ইত্যাদি ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে বোর্ডের তহবিল থেকে মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ ৩ লাখ টাকা এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা বাড়ানো হয়েছে। আরও জানতে ১৬১১৭ নম্বরে কল করুন বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট দেখুন।