সৌদি আরবের নয়া ইকামা আইন ২০২৬ সালে কার্যকর হয়েছে, যা কর্মীদের বেতন কাঠামো, ইকামা নবায়ন ফি ও পেনাল্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ন্যূনতম বেতন ৫,০০০ সৌদি রিয়াল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ইকামা নবায়নে বিলম্ব করলে দৈনিক ১০০ রিয়াল জরিমানা দিতে হবে। এই আইন প্রবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় আরও কঠোর হয়েছে।
নয়া ইকামা আইন ২০২৬ কী এবং কেন জরুরি?
২০২৬ সালে সৌদি আরব সরকার ইকামা আইনে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন এনেছে। এই আইনটি মূলত প্রবাসী কর্মীদের বসবাস ও কাজের অনুমতি নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন আইনের প্রধান লক্ষ্য হলো শ্রমবাজারকে আরও স্বচ্ছ করা, কর্মীদের অধিকার সুরক্ষিত করা এবং নিয়োগকর্তাদের দায়িত্বশীল করা।
নয়া ইকামা আইনের আওতায় পড়বেন সব প্রবাসী কর্মী, নির্ভরশীল পরিবারের সদস্য এবং ব্যবসায়িক ভিসাধারীরা। আগের আইনের তুলনায় এবার বেতন কাঠামো, নবায়ন ফি এবং পেনাল্টির ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম আনা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আগে ইকামা নবায়নে বিলম্ব করলে মাসিক জরিমানা ছিল ৫০০ রিয়াল; এখন তা দৈনিক ১০০ রিয়াল, যা অনেক বেশি।
এই পরিবর্তনগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এগুলো সরাসরি প্রবাসীদের পকেট ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে। সঠিক তথ্য না জানার কারণে অনেক কর্মী অযথা জরিমানা বা আইনি জটিলতায় পড়েন। তাই নয়া ইকামা আইনের বিস্তারিত জানা জরুরি।
নতুন বেতন কাঠামো: ন্যূনতম বেতন ও অন্যান্য শর্ত
নয়া ইকামা আইন অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকে সৌদি আরবে কর্মরত সব প্রবাসী কর্মীর জন্য ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৫,০০০ সৌদি রিয়াল (প্রায় ১,৩৩৩ মার্কিন ডলার)। এই বেতন অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিশোধ করতে হবে এবং তা নিয়োগকর্তার পক্ষ থেকে কর্মীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হবে।
বিভিন্ন পেশার জন্য বেতন স্কেলেও পরিবর্তন এসেছে। নিচের টেবিলে কিছু সাধারণ পেশার ন্যূনতম বেতন দেখানো হলো:
| পেশা | ন্যূনতম বেতন (সৌদি রিয়াল) |
|---|---|
| গৃহকর্মী (ডোমেস্টিক ওয়ার্কার) | ৫,০০০ |
| নির্মাণ শ্রমিক | ৫,৫০০ |
| ড্রাইভার | ৫,০০০ |
| নurse (নার্স) | ৬,০০০ |
| ইঞ্জিনিয়ার | ৮,০০০ |
| ডাক্তার | ১০,০০০ |
যদি কোনো নিয়োগকর্তা নির্ধারিত বেতন না দেন, তাহলে কর্মী সরাসরি সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগ দায়েরের জন্য সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া ‘ওয়াদি’ (Wady) অ্যাপের মাধ্যমেও বেতন সংক্রান্ত অভিযোগ জানানো সম্ভব।
ইকামা নবায়ন ফি ও পেনাল্টি: সম্পূর্ণ তালিকা
নয়া ইকামা আইনে নবায়ন ফি ও পেনাল্টির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিচের টেবিলে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
| বিবরণ | ফি/জরিমানা (সৌদি রিয়াল) |
|---|---|
| ইকামা নবায়ন ফি (প্রতি বছর, কর্মী) | ৮০০ |
| ইকামা নবায়ন ফি (প্রতি বছর, নির্ভরশীল) | ৬০০ |
| বিলম্বে নবায়নের জরিমানা (প্রতি দিন) | ১০০ |
| ভিসা ওভারস্টে (প্রতি দিন) | ১০০ |
| নিয়োগকর্তা পরিবর্তন ফি | ২,০০০ |
| কাজ ছেড়ে দেওয়ার জরিমানা (প্রথমবার) | ৫,০০০ |
| কাজ ছেড়ে দেওয়ার জরিমানা (পুনরায়) | ১০,০০০ |
মনে রাখবেন, ইকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়ন করতে হবে। সাধারণত ইকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে থেকে নবায়ন শুরু করা যায়। বিলম্ব করলে প্রতিদিন ১০০ রিয়াল জরিমানা দিতে হবে, যা আগের মাসিক ৫০০ রিয়ালের তুলনায় অনেক বেশি।
ভিসা ওভারস্টেও একই হারে জরিমানা দিতে হবে। তাই আপনার ইকামার মেয়াদ ও ভিসার বৈধতা সবসময় খেয়াল রাখুন।
কর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষা: নতুন আইনে কী কী সুবিধা?
নয়া ইকামা আইন কর্মীদের জন্য বেশ কিছু নতুন সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। প্রথমত, কাজের চুক্তি অবশ্যই লিখিত হতে হবে এবং তাতে বেতন, কাজের সময়, ছুটি ও অন্যান্য শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ‘মজুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা’ (Wage Protection System) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নিয়োগকর্তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বেতন পরিশোধ করতে হবে।
নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের নিয়মও সহজ করা হয়েছে। আগে নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া চাকরি পরিবর্তন করা যেত না; এখন কর্মী নির্দিষ্ট শর্তে নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করতে পারেন। যেমন, যদি নিয়োগকর্তা পরপর তিন মাস বেতন না দেন, তাহলে কর্মী শ্রম আদালতে আবেদন করে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের অনুমতি নিতে পারেন।
শ্রম আদালতে অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি: প্রথমে ‘ফিরদাউস’ (Firdous) বা ‘মওসি’ (Mawsee) অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে অভিযোগ করুন। অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে শুনানি হয়। যদি অভিযোগ সঠিক প্রমাণিত হয়, তাহলে আদালত নিয়োগকর্তাকে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করতে পারে।
আবেদন প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে ইকামা নবায়ন
ইকামা নবায়নের জন্য এখন অনলাইন পদ্ধতি বাধ্যতামূলক। নিচে ধাপগুলো দেওয়া হলো:
- Absher পোর্টালে লগইন করুন: আপনার Absher অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। অ্যাকাউন্ট না থাকলে সৌদি পাসপোর্ট বা ইকামা নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন।
- ইকামা সেবা নির্বাচন করুন: ‘My Services’ থেকে ‘Iqama Services’ বেছে নিন।
- নবায়ন অপশন: ‘Renew Iqama’ ক্লিক করুন। আপনার ব্যক্তিগত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেখাবে।
- প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস আপলোড করুন: পাসপোর্টের কপি, সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের ছবি (৪×৬ সেমি), এবং মেডিকেল সার্টিফিকেট (যদি মেয়াদ শেষ হয়ে থাকে)। মেডিকেল পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত হাসপাতালের তালিকা Absher-এ পাওয়া যায়।
- ফি পরিশোধ করুন: অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে (SADAD) ব্যবহার করে ফি দিন। নবায়ন ফি ৮০০ রিয়াল (কর্মীর জন্য) এবং নির্ভরশীলদের জন্য ৬০০ রিয়াল।
- নিশ্চিতকরণ: পেমেন্ট শেষে একটি রেফারেন্স নম্বর পাবেন। নবায়ন সম্পন্ন হতে ২৪-৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে।
টিপস: ইকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে থেকে নবায়ন শুরু করুন। মেডিকেল পরীক্ষা আগেই করে রাখুন, কারণ রিপোর্ট পেতে ২-৩ দিন সময় লাগতে পারে। কোনো ডকুমেন্ট জাল করবেন না; তা গুরুতর জরিমানা ও নির্বাসনের কারণ হতে পারে।
সৌদি আরবের নয়া ইকামা আইন নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা
ইকামা নবায়ন না করলে কী হবে?
ইকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রতিদিন ১০০ রিয়াল জরিমানা দিতে হবে। দীর্ঘদিন নবায়ন না করলে ভিসা বাতিল হতে পারে এবং আপনাকে সৌদি আরব ছেড়ে যেতে হবে। জরিমানা না দিলে ভবিষ্যতে সৌদি ভিসা পাওয়া কঠিন হবে।
বেতন কম পেলে কী করবেন?
প্রথমে নিয়োগকর্তার সাথে কথা বলুন। সমাধান না হলে সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের ‘ওয়াদি’ অ্যাপে অভিযোগ করুন। আপনার চুক্তি ও বেতন স্লিপ সংরক্ষণ করুন। অভিযোগের পর মন্ত্রণালয় তদন্ত করে এবং নিয়োগকর্তাকে জরিমানা করতে পারে।
নিয়োগকর্তা ইকামা দিচ্ছে না – করণীয়
নিয়োগকর্তা ইকামা দিতে বাধ্য। যদি না দেন, তাহলে Absher-এ ‘Absher for Individuals’ থেকে ‘Iqama Services’-এ গিয়ে ‘Report Employer’ অপশন ব্যবহার করুন। এছাড়া পুলিশ বা শ্রম মন্ত্রণালয়েও অভিযোগ করতে পারেন। মনে রাখবেন, ইকামা ছাড়া সৌদি আরবে থাকা বেআইনি।
উপসংহার
নয়া ইকামা আইন ২০২৬ সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসীদের জন্য বড় পরিবর্তন এনেছে। বেতন কাঠামো, নবায়ন ফি ও পেনাল্টির সঠিক তথ্য জানা থাকলে অপ্রয়োজনীয় জরিমানা ও জটিলতা এড়ানো সম্ভব। সবসময় সরকারি সূত্র যেমন Absher পোর্টাল বা সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে তথ্য যাচাই করুন। কোনো প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়বেন না—সরকারি মাধ্যম ছাড়া অন্য কোথাও ফি দেবেন না।
Frequently asked questions
ইকামা নবায়ন না করলে কী হবে?
ইকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রতিদিন ১০০ রিয়াল জরিমানা দিতে হবে। দীর্ঘদিন নবায়ন না করলে ভিসা বাতিল হতে পারে এবং আপনাকে সৌদি আরব ছেড়ে যেতে হবে। জরিমানা না দিলে ভবিষ্যতে সৌদি ভিসা পাওয়া কঠিন হবে।
বেতন কম পেলে কী করবেন?
প্রথমে নিয়োগকর্তার সাথে কথা বলুন। সমাধান না হলে সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের 'ওয়াদি' অ্যাপে অভিযোগ করুন। আপনার চুক্তি ও বেতন স্লিপ সংরক্ষণ করুন। অভিযোগের পর মন্ত্রণালয় তদন্ত করে এবং নিয়োগকর্তাকে জরিমানা করতে পারে।
নিয়োগকর্তা ইকামা দিচ্ছে না – করণীয়
নিয়োগকর্তা ইকামা দিতে বাধ্য। যদি না দেন, তাহলে Absher-এ 'Absher for Individuals' থেকে 'Iqama Services'-এ গিয়ে 'Report Employer' অপশন ব্যবহার করুন। এছাড়া পুলিশ বা শ্রম মন্ত্রণালয়েও অভিযোগ করতে পারেন। মনে রাখবেন, ইকামা ছাড়া সৌদি আরবে থাকা বেআইনি।
ছবি: tgwiazda / Wikimedia Commons, CC BY 3.0; Prof. Mortel / Wikimedia Commons, CC BY 2.0; Prof. Mortel / Wikimedia Commons, CC BY 2.0
💬 মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রশ্ন বা অভিজ্ঞতা লিখে প্রথম মন্তব্যটি করুন।






আপনার মন্তব্য বা প্রশ্ন লিখুন