মালয়েশিয়া যেতে কত টাকা লাগে কাজের ভিসা—এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট হিসাব হলো ২০২৬ সালের সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বোয়েসেল (BOESL) বা অনুমোদিত বৈধ চ্যানেলে কর্মী হিসেবে যেতে খরচ হয় মাত্র ৭৮,৯৯০ থেকে ১,০০,০০০ টাকার মধ্যে। তবে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগী দালালের মাধ্যমে এই ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বেড়ে বাস্তবে ৪,৫০,০০০ থেকে ৬,০০,০০০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। অথচ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার সমঝোতা স্মারক (MoU) অনুযায়ী ভিসা ফি, সিকিউরিটি ডিপোজিট এবং লেভির মতো বড় খরচগুলো সরাসরি নিয়োগকর্তার বহন করার কথা। ২০২৬ সালের হালনাগাদ নিয়ম অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় আইনগত ন্যূনতম মূল বেতন কার্যকর রয়েছে মাসিক ১,৭০০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (RM 1,700), যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫,০০০ থেকে ৪৮,০০০ টাকা।
বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে পা বাড়ানোর আগে সঠিক খরচের খতিয়ান এবং সম্ভাব্য আয়ের ভারসাম্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিলে সেই অভিবাসন ঋণ পরিশোধ করতেই কয়েক বছর কেটে যায়। এই লেখায় ২০২৬ সালের সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা, স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যয়, বিমান ভাড়া এবং বোয়েসেলের মাধ্যমে নিরাপদে স্বল্প খরচে যাওয়ার বাস্তবসম্মত উপায় তুলে ধরা হয়েছে।
মালয়েশিয়া যেতে কত টাকা লাগে কাজের ভিসা: ২০২৬ সালের সরকারি ও বেসরকারি চিত্র
২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়। একদিকে রয়েছে সরকারি নির্ধারিত জনবান্ধব নীতিমালা এবং অন্যপ্রান্তে মধ্যস্বত্বভোগীদের তৈরি করা কৃত্রিম সিন্ডিকেট। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় (KESUMA)-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত শ্রমচুক্তির মূল ভিত্তি হলো ‘Employer Pays Principle’ বা নিয়োগকর্তা বহন নীতি। এই আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড অনুযায়ী কর্মীর ভিসা প্রক্রিয়াকরণের সিংহভাগ আইনি ব্যয় কোম্পানির পরিশোধ করার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (BOESL)-এর মাধ্যমে যখন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আসে, তখন একজন কর্মীকে কেবল প্রাক-বহির্গমন মেডিকেল টেস্ট, পাসপোর্ট তৈরি, কল্যাণ তহবিল এবং সরকারি সার্ভিস চার্জ বাবদ ৭৮,৯৯০ থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকার মতো পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে, বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়ার ক্ষেত্রে চার থেকে পাঁচ স্তরের সাব-এজেন্ট বা গ্রাম্য দালালের উপস্থিতি দেখা যায়। ভিসা স্লট কেনাবেচা এবং কৃত্রিম মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ কর্মীকে ধারদেনা বা জমি বন্ধক রেখে ৪.৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক রসিদ দেওয়া হয় না, ফলে এটি সরাসরি কর্মীকে চরম আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
সরকারিভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার নির্ধারিত খরচ: প্রতিটি ধাপের পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান
সরকারি চ্যানেলে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভিসা হলে প্রতিটি ব্যয়ের আলাদা অফিশিয়াল রসিদ ও আইনি ভিত্তি থাকে। মালয়েশিয়া কাজের ভিসা ২০২৬-এর সরকারি খরচের প্রধান ধাপগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
- বোয়েসেল সার্ভিস চার্জ ও ডকুমেন্টেশন ফি: রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ, ভ্যাট এবং প্রাথমিক প্রসেসিং ফি বাবদ সাধারণত ৩০,০০০ থেকে ৪২,০০০ টাকা প্রয়োজন হয়। এটি সম্পূর্ণ অফিশিয়াল ব্যাংক পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।
- বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন ও স্মার্ট কার্ড ফি: জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET)-এর ডাটাবেজে নাম নিবন্ধন, প্রি-ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশন (PDO) এবং বায়োমেট্রিক ইমিগ্রেশন স্মার্ট কার্ড বাবদ খরচ হয় প্রায় ৪,০০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা।
- ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল ও জীবন বীমা: প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের সদস্যপদ, বাধ্যতামূলক জীবন বীমা এবং অভিবাসী কল্যাণ তহবিল মিলিয়ে প্রায় ৪,০০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। এই সুরক্ষার ফলে প্রবাসে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় কর্মীর পরিবার আর্থিক সুবিধা ও অনুদান পায়।
- FOMEMA অনুমোদিত মেডিকেল টেস্ট: মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স মেডিকেল এক্সামিনেশন অনলাইন সিস্টেম (FOMEMA) অনুমোদিত প্যানেল মেডিকেল সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে ২০২৬ সালে খরচ হয় প্রায় ৭,৫০০ থেকে ৯,৫০০ টাকা।
- বিমান ভাড়া: ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর একমুখী এয়ার টিকিট সাধারণ মৌসুমে ৩৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুসারে দায়িত্বশীল কোম্পানিগুলো এই টিকিটের খরচ সরাসরি বহন করে থাকে।

সরকারি খরচ বনাম এজেন্সির বাস্তবতা: ২০২৬ সালের তুলনামূলক হিসাব
সরকারি প্রক্রিয়ার নির্ধারিত ফি এবং বেসরকারি এজেন্সির বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে। নিচের তুলনামূলক সারণিটি দেখলে খরচের ফারাক পরিষ্কার বোঝা যাবে:
| খরচের খাত | সরকারি হিসাব (BOESL / আইনানুগ) | বেসরকারি এজেন্সি ও দালাল চক্রের বাস্তবতা |
|---|---|---|
| ভিসা ফি ও ইমিগ্রেশন চার্জ | নিয়োগকর্তা বহন করেন (০ টাকা) | ৫০,০০০ – ৮০,০০০ টাকা (অবৈধভাবে আদায়) |
| মেডিকেল স্ক্রিনিং (FOMEMA প্যানেল) | ৭,৫০০ – ৯,৫০০ টাকা | ১৫,০০০ – ২০,০০০ টাকা (কমিশনযুক্ত) |
| BMET স্মার্ট কার্ড ও কল্যাণ তহবিল | ৪,০০০ – ৪,৫০০ টাকা | ৮,০০০ – ১২,০০০ টাকা |
| বিমান টিকিট (একমুখী) | নিয়োগকর্তা / ৩৫,০০০ – ৪৫,০০০ টাকা | ৫০,০০০ – ৭০,০০০ টাকা (অতিরিক্ত মুনাফা) |
| সার্ভিস চার্জ ও মধ্যস্বত্বভোগী লাভ | বোয়েসেল ফি (৩০,০০০ – ৪২,০০০ টাকা) | ৩,০০,০০০ – ৪,০০,০০০ টাকা (সিন্ডিকেট স্লট প্রিমিয়াম) |
| সর্বমোট গড় খরচ | ৭৮,৯৯০ – ১,০০,০০০ টাকা | ৪,৫০,০০০ – ৬,০০,০০০+ টাকা |
| বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের সময় (ROI) | ৩ থেকে ৪ মাস | ১৮ থেকে ২৪ মাস |
বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বায়রা (BAIRA)-এর কিছু এজেন্সি সরাসরি কর্মী নিয়োগের অনুমতি পেলেও তৃণমূলের দালাল নেটওয়ার্কের কারণে খরচ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। চুক্তিপত্র অনুযায়ী মালয়েশিয়া সরকার নির্ধারিত লেভি ও সিকিউরিটি ডিপোজিট কোম্পানির পরিশোধ করার কথা থাকলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা এই অর্থ অনৈতিকভাবে সাধারণ শ্রমিকের কাঁধে চাপিয়ে দেয়।
২০২৬ সালে মালয়েশিয়ায় কাজের ভিসায় ন্যূনতম বেতন ও ওভারটাইম হিসাব
মালয়েশিয়ার জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নীতিমালা অনুসারে ২০২৬ সালে দেশটিতে সাধারণ বিদেশি কর্মীদের ন্যূনতম মূল বেতন কার্যকর রয়েছে মাসিক ১,৭০০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (RM 1,700)। পূর্বে যেখানে ন্যূনতম বেতন ছিল RM ১,৫০০, সেখানে সাম্প্রতিক সংশোধনের পর এটি কার্যকর হওয়ায় কর্মীদের আয়ে স্বস্তি ফিরেছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ১ রিঙ্গিত সমান প্রায় ২৭ থেকে ২৮ বাংলাদেশি টাকা ধরে হিসাব করলে মূল বেতন দাঁড়ায় প্রায় ৪৫,০০০ থেকে ৪৭,৬০০ টাকার কাছাকাছি।
তবে প্রবাসীরা কেবল মূল বেতনের ওপর নির্ভর করেন না। ইলেকট্রনিক্স ফ্যাক্টরি, রাবার ও পাম অয়েল প্ল্যান্টেশন, ওয়্যারহাউস বা নির্মাণ খাতে নিয়মিত ওভারটাইম (OT), নাইট শিফট এবং অ্যাটেনডেন্স বোনাস যুক্ত হয়। দৈনিক ২ থেকে ৩ ঘণ্টা নিয়মিত ওভারটাইম করলে মাস শেষে মোট উপার্জিত বেতন দাঁড়ায় RM ২,১০০ থেকে RM ২,৬০০। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫৮,০০০ থেকে ৭০,০০০ টাকা।
এই আয় থেকে ব্যক্তিগত খাওয়া খরচ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ মাসিক প্রায় RM ৪০০ থেকে RM ৫০০ (প্রায় ১১,০০০ থেকে ১৪,০০০ টাকা) বাদ দিলে একজন কর্মী প্রতি মাসে দেশে ৩৫,০০০ থেকে ৪৫,০০০ টাকা অনায়াসে পাঠাতে পারেন। যেসব কোম্পানি বিনামূল্যে উন্নত আবাসন ও যাতায়াত সুবিধা প্রদান করে, সেখানে মাস শেষে সঞ্চয়ের হার আরও বেশি হয়।
অভিবাসন ঋণ পরিশোধের বাস্তব হিসাব: কত দিনে আসল টাকা উঠবে?
মালয়েশিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিবাসন ব্যয়ের টাকা কত দিনে তুলে আনা সম্ভব তা নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে যাওয়া কর্মীরা প্রায়ই ভয়াবহ আর্থিক ও মানসিক চাপে ভোগেন, কারণ তাদের বেতনের প্রথম দুই বছরের বড় অংশ চলে যায় চড়া সুদের ঋণ পরিশোধ করতে।
যদি একজন কর্মী সরকারিভাবে বোয়েসেলের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা ব্যয়ে মালয়েশিয়া যান, তবে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৩৫,০০০ টাকা সঞ্চয় করলে মাত্র ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে পুরো খরচ তুলে ফেলতে পারেন। এরপর থেকে তার পুরো আয়ই পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ও সঞ্চয়ে ভূমিকা রাখে।
বিপরীতে, ৫.৫ লাখ টাকা সুদে ঋণ নিয়ে মালয়েশিয়ায় গেলে মাসিক সঞ্চয় ৩৫,০০০ টাকা দিয়ে সেই ঋণ এবং তার ওপর ধার্যকৃত উচ্চ সুদ মেটাতে টানা ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লেগে যায়। অর্থাৎ তিন বছরের ভিসা মেয়াদের প্রথম দুই বছর তিনি কার্যত কোনো ব্যক্তিগত সঞ্চয় ছাড়াই কেবল দেনা শোধ করতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন। এই আর্থিক ফাঁদ এড়াতে চড়া সুদে স্থানীয় দালালের কাছ থেকে টাকা না নিয়ে সরকারি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে বৈধ অভিবাসন ঋণ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
বোয়েসেল (BOESL) এর মাধ্যমে মালয়েশিয়া কাজের ভিসায় যাওয়ার সঠিক পদ্ধতি
দালালমুক্ত পরিবেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নামমাত্র খরচে মালয়েশিয়া যাওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বচ্ছ মাধ্যম হলো বোয়েসেল। এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
- নিয়মিত সার্কুলার পর্যবেক্ষণ: বোয়েসেলের নিজস্ব অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (boesl.gov.bd)-এ মালয়েশিয়া সরকারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। সেখানে শিক্ষাগত ও কারিগরি যোগ্যতা এবং সুনির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধার বিবরণ উল্লেখ থাকে।
- সরাসরি আবেদন: সার্কুলার প্রকাশের পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ অথবা বোয়েসেলের অনলাইন পোর্টালে সরাসরি আবেদন জমা দিতে হয়। এতে কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ থাকে না।
- সরাসরি ইন্টারভিউ ও সিলেকশন: নির্বাচিত প্রার্থীদের বোয়েসেল কার্যালয় বা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (TTC) মালয়েশিয়ান কোম্পানির উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের সামনে সরাসরি মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে হয়। উত্তীর্ণ কর্মীদের সরাসরি অফিশিয়াল জব অফার লেটার দেওয়া হয়।
- মেডিকেল ও বিএমইটি স্মার্ট কার্ড গ্রহণ: অফার লেটার পাওয়ার পর নির্দিষ্ট FOMEMA অনুমোদিত প্যানেল ক্লিনিকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়। এরপর বোয়েসেল নিজ দায়িত্বেই বিএমইটি স্মার্ট কার্ড ও বহির্গমন ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করে দেয়।
দালাল ও ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সির ফাঁদ এড়ানোর ৫টি জরুরি সতর্কতা
মালয়েশিয়ার কলিং ভিসার খবর ছড়িয়ে পড়লেই গ্রামগঞ্জে বিভিন্ন অনুমোদনহীন দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতারণা এড়াতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলুন:
- লাইসেন্সবিহীন কাউকে টাকা না দেওয়া: বায়রা (BAIRA) বা বিএমইটি অনুমোদিত বৈধ আরএল (RL) নম্বরযুক্ত এজেন্সি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা ট্রাভেল এজেন্সিকে অর্থ দেবেন না। বিএমইটির ওয়েবসাইট থেকে এজেন্সির লাইসেন্স যাচাই করে নিন।
- কলিং ভিসার সত্যতা যাচাই: কোনো এজেন্সি ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি করলে মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টের (JIM) অফিশিয়াল পোর্টালে গিয়ে ই-ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিটের রেফারেন্স নম্বর দিয়ে যাচাই করুন।
- সব ধরনের লেনদেনে ব্যাংক ব্যবহার করুন: যে কোনো অর্থ লেনদেন সরাসরি এজেন্সির অফিশিয়াল ব্যাংক একাউন্টে পে-অর্ডার বা চেকের মাধ্যমে করুন এবং নির্দিষ্ট সিলমোহরযুক্ত রসিদ সংরক্ষণ করুন। নগদ টাকা দিলে ভবিষ্যতে অভিযোগের কোনো আইনি ভিত্তি থাকে না।
- ভিজিট বা ট্যুরিস্ট ভিসায় কাজের উদ্দেশ্যে যাবেন না: দালালের কথায় আশ্বস্ত হয়ে ট্যুরিস্ট ভিসা বা প্রফেশনাল ভিজিট পাসে মালয়েশিয়া যাবেন না। ভিজিট ভিসায় মালয়েশিয়ায় কাজ করা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ, যার পরিণতি জেল ও স্থায়ী ব্ল্যাকলিস্ট।
- অবাস্তব বেতনের প্রতিশ্রুতি পরিহার করুন: সাধারণ কারখানা বা ক্লিনার পদের কাজে কোনো দালাল যদি প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে তা শতভাগ ভুয়া ও প্রতারণামূলক ফাঁদ।
২০২৬ সালের নতুন নীতিমালা ও পরিবর্তন যা জানা দরকার
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মালয়েশিয়া সরকার নতুন Employment (Amendment) Act 2025 কার্যকর করেছে, যার ফলে বিদেশি কর্মীদের অধিকার আরও শক্তিশালী হয়েছে। এখন নিয়োগকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে কর্মীর পাসপোর্ট নিজে রাখা নিষিদ্ধ, সপ্তাহে একদিন ছুটি দেওয়া বাধ্যতামূলক, এবং বেতন বিলম্ব করলে জরিমানার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিএমইটি (BMET) ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সার্কুলার জারি করেছে যেখানে বলা হয়েছে, যেকোনো রিক্রুটিং এজেন্সি যদি সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে, তবে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে এবং আইনি কার্রবাই করা হবে। এই নতুন নিয়মগুলো মালয়েশিয়া যেতে কত টাকা লাগে কাজের ভিসা সম্পর্কে কর্মীদের সচেতনতা বাড়িয়েছে।
প্রবাসী কর্মীদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখুন: বাস্তব কেস স্টাডি
ঢাকার কেরানীগঞ্জের রহিম উদ্দিন (বদলানো নাম) ২০২৫ সালে একটি বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করে মালয়েশিয়া যান। তিনি একটি ইলেকট্রনিক্স ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন এবং মাসিক RM ২,৩০০ উপার্জন করেন। কিন্তু প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা বাড়ি পাঠানোর পর তার হাতে থাকা টাকা ঋণের কিস্তি দিতে হয়। তিনি বলেন, “আমি যদি বোয়েসেলের মাধ্যমে যেতাম তবে এখন পর্যন্ত আমার ঋণ শোধ হয়ে যেত এবং আমার কিছু সঞ্চয় থাকত।” অন্যদিকে, চট্টগ্রামের জামাল হোসেন বোয়েসেলের মাধ্যমে ৯৫ হাজার টাকা খরচ করে ২০২৬ সালের মার্চে মালয়েশিয়া যান। তিনি ৪ মাসে নিজের খরচ তুলে ফেলেছেন এবং এখন প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা বাড়ি পাঠাচ্ছেন। এই দুটি বাস্তব উদাহরণ মালয়েশিয়া যেতে কত টাকা লাগে কাজের ভিসা সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব বোঝায়।
প্রস্থান পূর্বে চেকলিস্ট: যাতে কোনো সমস্যা না হয়
- বোয়েসেলের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সার্কুলার ডাউনলোড করে রক্ষা করুন।
- পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ১৮ মাস বাকি আছে কিনা যাচাই করুন।
- FOMEMA অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকা বিএমইটির ওয়েবসাইট থেকে নিন।
- প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে অভিবাসন ঋণের জন্য আবেদন করুন (সুদ হার ৫-৭%)।
- নিয়োগকর্তার কোম্পানির নাম, ঠিকানা এবং যোগাযোগ নম্বর নোট করুন।
- বিমান টিকিটের কনফার্মেশন কপি এবং ভিসা গ্রান্ট লেটার প্রিন্ট করে রাখুন।
- যদি কোনো সমস্যা হয় তবে বিএমইটির হটলাইন ১৬৪৩০ এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশনের নম্বর (+603-2161 8822) সংরক্ষণ করুন।
আরও জানতে পড়ুন: মালয়েশিয়া কাজের ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া ২০২৬: ধাপে ধাপে পূর্ণ নির্দেশিকা।
Frequently asked questions
২০২৬ সালে মালয়েশিয়া যেতে কত টাকা লাগে কাজের ভিসা?
সরকারি চ্যানেল (বোয়েসেল) দিয়ে যেতে ৭৮,৯৯০ থেকে ১,০০,০০০ টাকা খরচ হয়। বেসরকারি এজেন্সি বা দালালের মাধ্যমে খরচ ৪,৫০,০০০ থেকে ৬,০০,০০০ টাকায় পৌঁছায়।
মালয়েশিয়ায় ২০২৬ সালের ন্যূনতম বেতন কত?
২০২৬ সালে মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের ন্যূনতম মূল বেতন মাসিক ১,৭০০ রিঙ্গিত (RM 1,700), যা প্রায় ৪৫,০০০–৪৮,০০০ বাংলাদেশি টাকা।
বোয়েসেলের মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রক্রিয়া কত দিন লাগে?
সার্কুলার প্রকাশ থেকে প্রস্থান পর্যন্ত সাধারণত ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগে, তবে কোম্পানির ইন্টারভিউ শিডিউল ও মেডিকেল রিপোর্টের উপর নির্ভর করে সময় কম-বেশি হতে পারে।
ছবি: Vyacheslav Argenberg / Wikimedia Commons, CC BY 4.0; Pradana Aumars (talk · contribs) / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0
💬 মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রশ্ন বা অভিজ্ঞতা লিখে প্রথম মন্তব্যটি করুন।








আপনার মন্তব্য বা প্রশ্ন লিখুন